Latest Breaking

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় কুমার মুখার্জীর জন্ম বার্ষিকী পালনে উদ্যোগী মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা


অজয়  কুমার মুখার্জী , জন্ম: ১৫-০৪-১৯০১, মৃত্যু :২৭-০৫-১৯৮৬

কলকাতা :  অজয় মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষা তমলুকের - হ্যামিলটন স্কুল, পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ। ১৯০১ সালে ভারতের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তমলুক মহকুমার তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের অন্যতম নেতা। ১৯৪২সালে শুরু হওয়া আইন আমান্য আন্দোলনের সময় অর্থাৎ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ১৭ ডিসেম্বর এই সরকার কার্যকর হয়। তিনি স্বামী বিবেকানন্দ দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। পূর্বে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সদস্য ছিলেন। পরে তিনি বাংলা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯৬৭-১৯৭১সালে দুটি যুক্ত ফ্রন্ট সরকারে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী )র সঙ্গে যৌথ ভাবে শাসন করেছিল। তিনি উভয় সরকারের মুখ্য মন্ত্রী পদে অধিষ্টিত ছিলেন। প্রথমবার ১৯৬৭ সালের মার্চ মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় বার ১৯৬৯সালের ফেব্রুয়ারী থেকে ১৯৭০ দলের মার্চ মাস পর্যন্ত। ১৯৬৭ সালে অজয় মুখোপাধ্যায় আরামবাগ বিধানসভা কেন্দ্রে গান্ধীবাদী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন কে পরাজিত করে তিনি মুখ্য মন্ত্রী হন। আরামবাগে তাঁর বিজয় কেতনের স্থপতি ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা নারায়ণ চন্দ্র ঘোষ। ১৯৬৮ সালে আরামবাগ ঘাটাল মহকুমায় বেশ কয়েকটি বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শনের জন্য নারায়ণ চন্দ্র ঘোষ কয়েকদিন ধরে নৌকায় অজয় মুখার্জী র সঙ্গী হয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে অজয় ​​মুখার্জি তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী সুশীল ধাড়ার সঙ্গ  ত্যাগ করে  প্রণব মুখার্জি  ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আর)-এ যোগ দেন । প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে কেন্দ্রে মন্ত্রীর পদের প্রস্তাব দিলেও , অজয় ​​মুখার্জি তাঁর বয়স ও স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এই পদের জন্য প্রণব মুখার্জিকে সুপারিশ করেন, যিনি পরে ভারতীয় মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হন।

তিনি ১৯৭৭ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন । 

তাঁর ভাই বিশ্বনাথ মুখার্জি ও ভাইয়ের স্ত্রী  গীতা মুখার্জি উভয়েই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন । অজয় মুখোপাধ্যায় এর ভাইঝি কল্যাণী (আরেক ভাইয়ের মেয়ে) মোহন কুমারামঙ্গলমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তিনি রঙ্গরাজন কুমারামঙ্গলম ও ললিতা কুমারামঙ্গলমের মাতা ছিলেন ।

অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়  ১৯৮৬ সালের ২৭শে মে কলকাতায় পরলোক গমন করেন। 

তিনি তখন সেচমন্ত্রী। মাঝে মাঝে যেতেন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায়। কাজ শেষে সেখান থেকে ফিরতেন তমলুকের বাড়িতে। কিন্তু কোনও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতেন না। দেহরক্ষী রাখতেন না। একবারের একটি ঘটনা। প্রতিবেশী এবং কংগ্রেস কর্মী অজয় মালাকারকে পুলিশ এসে খবর দিল, মন্ত্রী পুরুলিয়া থেকে ফিরছেন। রাত ১১টার সময়ে নামবেন মেচেদা স্টেশনে। স্টেশনে ট্রেন এল। হঠাৎ মন্ত্রীর গলা, ‘‘এই অজয় আয় আয়, আমি এখানে।’’ ট্রেন থেকে নেমেই আশঙ্কায় মন্ত্রী। বললেন, ‘‘এত রাতে আমি বাড়ি যাব কী করে?’’ অজয় মালাকার একটা ট্যাক্সি জোগাড় করেছিলেন। তিরিশ টাকা ভাড়া। সেই ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরলেন রাজ্যের সেচমন্ত্রী। তার আগে এক চোট রাগারাগি হয়েছে স্টেশনে। মন্ত্রীকে সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন এসকর্টের কয়েকজন পুলিশ। তাঁদের দেখেই বিরক্ত হন মন্ত্রী। রেগে বলেন - এত রাতে বিরক্ত করতে এসেছে! যাও’।


গাড়ি ছেড়ে মন্ত্রী ট্রেনে যাতায়াত করতেন ! এখন এমন ঘটনা কল্পনা করা বিরলতম । কিন্তু এমনই ছিলেন অনন্য ব্যাক্তিত্ব অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। একাধিক পরিচয় এই মানুষটির। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আবার স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু জীবনযাত্রায় একেবারে সরল, সাদাসিধে। যদিও জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে  আদর্শের জন্য তাঁকে লড়তে হয়েছে। দিতে হয়েছে মূল্যও।

অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি ছিল তমলুকের মালিজঙ্গলে। সাবেকি বনেদিয়ানার ছাপ মাখা বাড়ি। তবে তাঁরা তমলুকের আদি বাসিন্দা নন। আদতে তাঁরা হুগলির বাসিন্দা ছিলেন। বাবা শরৎ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। আইন ব্যবসার কারণেই শরৎ মুখোপাধ্যায় তমলুকে আসেন। তিনি তমলুক বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদকও হয়েছিলেন। তরুণ অজয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মোহনদাস করম চাঁদ গাঁধীর ডাকে অসহযোগ, আইন অমান্য এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ব্যাপক ভাবে সাড়া দিয়েছিল তমলুক। সেই আন্দোলনের যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। ১৯৪২ সালের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তমলুকে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কারণ ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীন‘মহাভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র "তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ "ঘোষণা হয়েছিল। স্বাধীন সরকার গঠনের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন তিনি। সরকারের সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে তিনি দ্বিতীয় সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব নেন। পরে তিনিও গ্রেফতার হন। মুক্তি পেয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার চেষ্টায়।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর,১৯৫২ সালে দেশের প্রথম সাধারণ উপনির্বাচনে তমলুক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হলেন। দাঁড়াতে হল নিজের ভাই বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। বিশ্বনাথ ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী। অজয় মুখোপাধ্যায় হলেন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সেচ ও জলপথ বিভাগের মন্ত্রী। গ্রাম বাংলার নদী-নালা সংস্কারের কাজ শুরু করেছিলেন। তমলুক মহকুমার জগন্নাথখালি, সোয়াদিঘি, প্রতাপখালি, গঙ্গাখালি, পায়রাটুঙ্গি, বাঁপুর খাল সংস্কার করেন,তাতে অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় কৃষিক্ষেত্রে উন্নতিতে সহায়ক হয়। অজয় মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টাতেই তমলুকে ১৯৬২ সালে ১২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১২৫ শয্যার মহকুমা হাসপাতাল তৈরি হয়।তমলুক তথা পূর্ব মেদিনীপুরের আপামর কৃষিজীবি মানুষ আজ এই হাসপাতালে চিকিৎসার দ্বারা উপকৃত হচ্ছে।বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পরে প্রফুল্লচন্দ্র সেনের মন্ত্রিসভাতেও তিনি সেচ এবং জলপথের দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু এই সময়ে দুর্নীতি-সহ নানা কারণে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। দলের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে মাদ্রাজের মুখ্যমন্ত্রী কামরাজের নেতৃত্বে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় কংগ্রেস শাসিত রাজ্যে মন্ত্রিসভার সদস্য কমানো হবে এবং নেতাদের সাংগঠনিক কাজ করতে হবে।

মন্ত্রিত্ব থেকে সরতে হয় অজয় মুখোপাধ্যায়কে। জনমানসে দলের আস্থা ফেরাতে মেদিনীপুরের কংগ্রেস সভাপতি গ্রামেগঞ্জে সভা করতে শুরু করেন। কিন্তু দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রবল রূপ নেয়।তাঁকে জেলা কংগ্রেস এবং রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে বাংলা কংগ্রেস দলের জন্ম। ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার শ্যামস্কোয়ারে কর্মী সম্মেলনে জন্ম হয় নতুন দলের। ফলে কংগ্রেসের সদস্যপদ যায় তাঁর। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে বাংলা কংগ্রেস-সহ চার দলের ‘পিপলস ইউনাইটেড লেফট ফ্রন্ট’ গঠন করেন। ওই নির্বাচনেই অজয়বাবুর মুখ্যমন্ত্রিত্বে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সরকার  টেকেনি একাধিক কারণে। অন্তর্বর্তী নির্বাচনেও মুখ্যমন্ত্রী হন। তখন রাজ্যের পরিস্থিতি ভয়াবহ। নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশে নিজের সরকারকে ‘অসভ্যের সরকার’ আখ্যা দিয়ে ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর কার্জন পার্কে বাংলা কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে অনশন সত্যাগ্রহে বসেন। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা ছিল, ‘আইনশৃঙ্খলার উন্নতি না হলে ছেঁড়া জুতোর মতো মন্ত্রিত্ব ছেড়ে চলে যাব। তবুও আদর্শভ্রষ্ট হব না, অত:পর পদত্যাগ করেন। বেতার ভাষণে বলেন- এই অবস্থায় গদি আঁকড়ে থাকার চেষ্টা মানে জনসাধারণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা’।

কিন্তু সংসদীয় রাজনীতির জীবন বারবারই বাধা পেয়েছে। একসময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নিজের মন্ত্রিসভার উপমুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে। তবে বরানগর কেন্দ্রে তিনি জ্যোতি বসুর কাছে পরাজিত হন। তমলুকে জয় আসে। ১৯৭১ সালে তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হলেও সরকারের পতন হয় দ্রুত। মাত্র ৮৩ দিনে। ফিরেছিলেন কংগ্রেসে। ’৭২ সালে তমলুক থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক কাজকর্ম থেকে সরে যাচ্ছিলেন। ’৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে স্বাধীনতা আন্দোলনের সহযোদ্ধা সুশীলকুমার ধাড়ার কাছে পরাজিত হলে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তমলুক ছেড়ে কলকাতায় এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে যান।

সরল ছিল জীবনযাপন। নিরামিষ খেতেন। পরনে চটি জুতো। হাঁটুর উপর পর্যন্ত খদ্দরের কাপড় আর হাতকাটা জামা পরতেন। ভাই বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বামপন্থী মনোভাবাপন্ন। তাঁর স্ত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়ও রাজ্য রাজনীতির নামী মুখ। সকলেই থাকতেন একই বাড়িতে। অজয় মালাকার প্রতিবেশী এবং কংগ্রেস কর্মী। অজয়বাবুর সঙ্গী ছিলেন।  সহকর্মী অজয় একটি ঘটনার কথা জানান। তমলুকে রাজ ময়দান আর কোর্ট প্রাঙ্গণে দামু (বিশ্বনাথ) আর দাদার মিটিং। চলছে পরস্পরকে দোষারোপ। কিন্তু বাড়ি ফিরে খেতে বসার আগে ছোটভাই দামুর খোঁজ। নারকেল মুড়ি ভালবাসতেন। অনেক সময়ে রাতে ফিরে দেখতেন খাবার ব্যবস্থা নেই। নারকেল মুড়ি দিয়ে আসতেন অজয় মালাকার।

শেষ জীবনে কন্যাসমা নার্স রাঁচির আদিবাসী কন্যা তিরু দেখাশোনা করতেন। জীবনের শেষদিনের একটি ছবিতে দেখা যায়, বাঁশের খাটিয়ায় শোয়ানো রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। দড়ি দিয়ে বাঁধা। রয়েছেন গীতা মুখোপাধ্যায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়। আর হাঁটু গেড়ে হরিপদ দোলই যিনি  তমলুকের কংগ্রেস অফিসে রান্না করতেন। তিনি তমলুকে ফিরে জানান, শেষযাত্রার দিনে প্রণব মুখোপাধ্যায় পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে দিয়েছিলেন,শেষযাত্রার খাট  কিনে আনার জন্য। এনেছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু দেহ আসেনি তমলুকে।


ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছিল তমলুক। সেই আন্দোলনের যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের একজন ছিলেন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় (Ajoy Mukherjee)। ১৯৪২ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন তমলুকে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কারণ ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীন ‘মহাভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ ঘোষণা হয়েছিল। স্বাধীন সরকার গঠনের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন তিনি।তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোদমে চলছে। পাশাপাশি ভারতে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা পুঞ্জীভূত হচ্ছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তখন ভারতের বাইরে। সেখান থেকে চালাচ্ছেন তাঁর সংগ্রাম। দেশে রয়েছেন মহাত্মা গাঁধী। তাঁকে ঘিরেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছেন তামাম ভারতবাসী। ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন মহাত্মা গাঁধী। আর তাঁর একডাকে ভারত জুড়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পথে নামলেন ভারতবাসী। ওই ঘটনায় প্রমাদ গুনল ব্রিটিশ শাসকরা। আন্দোলনের শুরুতেই একাধিক কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী।। গ্রেফতার করা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীকেও। নেতৃত্বের একটা বড় অংশ জেলে চলে যাওয়ার ফলে প্রভাব পড়েছিল আন্দোলনেও। সেই সময়ে পুরো আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিল জনগণ। কয়েকদিনের মধ্যেই দেশের বড় শহরগুলির সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট শহর, গ্রাম-জনপদেও আন্দোলন ছড়িয়ে যায়। ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক হিসেবে থানা থেকে আদালত, ডাকঅফিস— সবকিছুর উপরই হামলা হতে শুরু করে। বেশ কিছু এলাকায় হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয়। অনেক জায়গায় স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে আন্দোলন। ঠিক এই সময়েরই আশেপাশে দেশের বেশ কিছু এলাকায় তৈরি হয়েছিল জাতীয় সরকার। সেগুলিরই মধ্যে একটি হল বাংলার বুকে তৈরি হওয়া তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার। যাঁদের হাতে এই সরকার তৈরি হয়েছিল তাঁরা হলেন সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায়, সুশীলকুমার ধাড়া। তাঁরা তিনজনই মেদিনীপুরের কংগ্রেস নেতা ছিলেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হওয়ার পরপরই দমনমূলক নীতি নিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। সারা দেশের মতোই মেদিনীপুর জেলাতেও গ্রেফতার করা হয়েছিল জেলার একাধিক নেতাকে।ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরুর পর একমাস কেটেছে। সেই সময়েই তৎকালীন মহিষাদল থানা এলাকায় থাকা দানিপুর গ্রামে একটি ঘটনা ঘটে। ওই এলাকায় একটি গুদাম থেকে ব্রিটিশদের জন্য পাঠানো হচ্ছিল ধান ও চাল। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে ভিড় করেন বিপুল সংখ্যক গ্রামবাসী। মিলের মালিককে বলা হয় এভাবে বাইরে খাদ্যশস্য না পাঠাতে, তাহলে এলাকায় খাদ্যাভাব দেখা দেবে। এই ঝামেলার কথা শুনে সেখানে আসে ব্রিটিশ পুলিশ। নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের উপর গুলি চালিয়েছিল তারা। ওই ঘটনায় প্রাণ দিয়েছিলেন তিনজন গ্রামবাসী। ওই ঘটনার পরেই যেন বিদ্রোহের বীজ নিহিত হয়ে গিয়েছিলে গোটা তমলুকের বাসিন্দাদের মনে।১৯৪৩ সালের ২৬ জানুয়ারি এই বিষয়ে একটি ঘোষণাপত্র বেরোয় ‘বিপ্লবী’ পত্রিকায়। সেখানে বলা হল, মহকুমার মানুষ তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই সরকারের স্বরাষ্ট্র এবং অর্থের দায়িত্বে ছিলেন অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়। ঘোষণা পত্রে বলা হল, ভারত যখন স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, তখন সেখানে এই জাতীয় সরকার যোগ দেবে। প্রায় সবক্ষেত্রেই অসাধারণ সাফল্যের চিহ্ন রেখেছিল তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার। যদিও লড়াই কম ছিল না। ব্রিটিশরা টানা খোঁজ করে যাচ্ছিল সতীশ সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায়, সুশীল ধাড়াদের। কিন্তু খোঁজ পাচ্ছিল না। কারণ, স্থানীয়রাই অপার মমতা ও শ্রদ্ধার আড়াল করে রাখতেন, সাহায্য করতেন নেতা এবং কর্মীদের। যাঁরা এই সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তঁরা সকলেই মনেপ্রাণে ছিলেন গান্ধীর শিষ্য। অহিংসায় বিশ্বাসী, কিন্তু পরিস্থিতির জন্য বিভিন্ন সময় এই আন্দোলনে হিংসার আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে, পুলিশের কাছে খবর পাঠায় এমন বিশ্বাসঘাতক ধরা পড়ার পরে কড়া সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে।সতীশ সামন্ত গ্রেফতার বরণ করলেন ১৯৪৩ সালের ২৬ মে। তিন বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর। তখন জাতীয় সরকারের দায়িত্ব নেন অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়। তিনিও গ্রেফতার হন ১৯৪৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। সেই সময়ে বাংলায় চলছে তেতাল্লিশের মন্বন্তর। সেই কঠিন সময়েও অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার, চালিয়েছে ত্রাণের কাজও।সেই অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় স্বাধীনতার পর রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছিলেন।

অজয় মুখার্জী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি ছিলেন এক যুগপ্রবর্তক নেতা, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তমলুক তথা সমগ্র বাংলার ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয়।অজয় মুখার্জী ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক ও জননেতা, যার জীবন আমাদের কাছে এক অনন্য প্রেরণা। তাঁর অবদান শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের চিন্তা-চেতনায় চিরজাগরূক হয়ে রয়েছে।

লেখক : শ্যামাপদ জানা , সাধারণ সম্পাদক, মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা

No comments