Latest Breaking

অজয় মুখার্জী পর দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হবেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র, স্বপ্ন ফেরী হচ্ছে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে !


অনন্যা ব্যানার্জী, ভবানীপুর ( কলকাতা ) : খাতায় কলমে কাউকে মুখ্যমন্ত্রী প্রজেক্ট করেনি বিজেপি ! কিন্তু নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে নানা গুঞ্জন। ভবানীপুর থেকে যিনি জিতবেন তিনিই হবেন মুখ্যমন্ত্রী ! এই কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।

ভবানীপুর কেন্দ্রের নানা জায়গায় চলছে  জোরদার ভোটের প্রচার। নববর্ষের প্রথম দিন সাতসকালে পদযাত্রা করেন শুভেন্দু। সন্ধ্যায় এই কেন্দ্রে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করার কথা রয়েছে  বিজেপি প্রার্থীর।তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে ভবানীপুরে বেশি সময় দিচ্ছেন শুভেন্দু।

প্রায় 55 বছর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থেকে বিধানসভা ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায় ।১৯৫১ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত তিনি টানা সাতবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতা সংগ্রামী অজয় মুখার্জী।

 মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র এবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন বলে স্বপ্ন ফেরী  করে চলেছেন   বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর পিতা শিশির অধিকারী। মেদিনীপুরের বিভিন্ন কেন্দ্রে  প্রচার করতে গিয়ে শিশির বাবু দাবি করেন, " মোদী জি অমিত শাহ জি নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পাটি  200 টি বেশি আসন নিয়ে সরকার গড়বে। আপনাদের ঘরের ছেলে ( মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র)  মুখ্যমন্ত্রী হবেন, একথা আপনাদের কাছে বলে দিয়ে গেলাম," আবেগ তাড়িত হয়ে তিনি আরও বলেন, "আমাদের বুকের ভেতর যে যন্ত্রণা আমার আপনার সবার ভেতরে  আছে, মেদিনীপুর বারে বারে প্রতারিত হয়েছে, অজয় মুখার্জিকে প্রতারণা করা হয়েছে, সতীশ সামন্ত, কুমার জানাকে প্রতারিত করা হয়েছে, এবার মোদী জি, অমিত শাহ জী দয়ায়, আপনার ঘরের ছেলে মুখ্যমন্ত্রী হবে। আমি আশা করি, মেদিনীপুর তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে।"

  রাজ্য বিজেপিতে একাধিক হেভিওয়েট মুখ থাকলেও কাউকেই 'মুখ্যমন্ত্রী-মুখ' করে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেনি বিজেপি। তবে, এনিয়ে রাজ্যের বড় অংশের মানুষের কৌতূহল রয়েছে। কারণ, বিভিন্ন সমীক্ষায় তৃণমূল-বিজেপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। সেক্ষেত্রে ৪ মে ফল ঘোষণার পর গেরুয়া শিবির যদি শেষ হাসি হাসে4 তাহলে কার নেতৃত্বে চলবে সরকার, এনিয়ে এখন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় চলছে চর্চা।  বিজেপির 'সঙ্কল্প পত্র' প্রকাশের অনুষ্ঠানেও তা নিয়েই প্রশ্ন করা হয়েছিল অমিত শাহ-কে। বিজেপি কী কী প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে এবার বঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছে, সেই সংক্রান্ত ঘোষণার পর সাংবাদিকদের তরফে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের হবু মুখ্যমন্ত্রী কি আপনার সঙ্গেই বসে আছেন ? এদের মধ্যেই কেউ হবেন ? যার উত্তরে শাহ বলেন, "আমরা তো কোনও বংশ-পরম্পরার পার্টি নই। যে, দিদির পর ভাইপো হবেন। যে কোনও বাঙালি হতে পারেন। বাংলারই বাসিন্দা বিজেপি থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এ ব্যাপারে চিন্তা করবেন না। তিনি সক্ষমও হবেন। যোগ্যও হবেন, নেতাও হবেন। সুশাসনও আনবেন।" প্রসঙ্গত, বিজেপির ইস্তেহার 'ভরসার শপথ' প্রকাশের অনুষ্ঠানে শাহ ছাড়া,  উপস্থিত ছিলেন  ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী।

বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মুখ্যমন্ত্রী কাউকে প্রজেক্ট না করলেও, মুখ্যমন্ত্রীকে হারাতে পারলে এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভবানীপুরের প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হবেন, এমনটাই  জোর কদমে প্রচার চালাচ্ছে বিজেপি। 

 ব্রিটিশদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে,   পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে  যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় । ১৯৪২ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল।  ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীন ‘মহাভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ ঘোষণা হয়েছিল। স্বাধীন সরকার গঠনের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন  সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায়, সুশীলকুমার ধাড়া। তিনজনই মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র। 

তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের  স্বরাষ্ট্র এবং অর্থ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়। সতীশ সামন্ত গ্রেফতার বরণ করলেন ১৯৪৩ সালের ২৬ মে। তিন বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর। তখন জাতীয় সরকারের দায়িত্ব নেন অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়। তিনিও গ্রেফতার হন ১৯৪৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। 

 অজয় মুখোপাধ্যায় স্বাধীনতার পর রাজ্যের মন্ত্রী হলেন। বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সেচ ও জলপথ বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন। বিধানচন্দ্রের মৃত্যুর পরে প্রফুল্লচন্দ্র সেনের মন্ত্রিসভাতেও তিনি সেচ এবং জলপথের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫২ সালে দেশের প্রথম সাধারণ উপনির্বাচনে তমলুক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান। নিজের ভাই বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জিতে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন অজয় মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর কার্জন পার্কে বাংলা কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে অনশন সত্যাগ্রহে বসেন।   মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন । ১৯৭৭ সালে  তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ।

তৃণমূলের জেলা সভাপতি সুজিত রায় বলেন, গল্পের গরু গাছে চড়ে! নন্দীগ্রামে বিজেপি কত ভোটে হারে দেখুন, তারপর ভবানীপুর নিয়ে আলোচনা হবে। অজয় মুখার্জীর সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে নন্দীগ্রাম বা ভবানীপুরের ভোটারকে বোকা বানানো এত সহজ নয়! চতুর্থ দফায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  মুখমন্ত্রীর শপথ নেওয়া, এখাও। কেবল সময়ের অপেক্ষা।

রাজ্যে কোন দল ক্ষমতায় আসবে এই নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। উন্নয়ন আর ভাতা দিয়ে বাজিমাত করতে চাইছে তৃণমূল, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান বিরোধী চোরা স্রোতে জয়ের স্বপ্ন দেখছে বিজেপি। 55 বছর পর মেদিনীপুরের কোনো ভূমিপুত্র দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হবেন কিনা, ৪ মে ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে রাজনৈতিক মহল।

No comments